ঢাকা, ১৫ মে, ২০২১
Generation's Voice
সর্বশেষ:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেরা কনটেন্ট নির্মাতাদের অ্যাওয়ার্ড রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় ভাষা সংগ্রামীদের কাছে প্রথম বর্ণ পরিচয়ের দুর্লভ সুযোগ সাংসদ লিটন হত্যা মামলায় সাবেক এমপি রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন সিলেটে নিজ বাড়িতে ফিরলেন খাদিজা বিডিআর বিদ্রোহে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
১০১৪

কৃষির জন্য ন্যানো প্রযুক্তি জাগিয়েছে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ নভেম্বর ২০১৮  

গত জুলাইয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ (খসড়া) অনুমোদন হয়। দেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে জাতীয় কৃষিনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ন এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নেতৃত্বদানে সফলতার জন্য কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় উন্নয়নশীল বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য অনন্য। জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে সবচেয়ে চমকপ্রদ সংযোজন হচ্ছে কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি। জাতীয় কৃষিনীতির অনুচ্ছেদ ৩-এর ৩.৩-এ বর্ণিত গবেষণার পরিধি ও ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ন্যানো প্রযুক্তিকে গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হলো— ১. ফসলের রোগ নির্ণয়, জাতভিত্তিক পুষ্টি চাহিদা নির্ণয়, পুষ্টি আহরণ ক্ষমতা বৃদ্ধি; ২. ন্যানো সেন্সর প্রযুুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূমির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ এবং ৩. কৃষিতে ও কৃষি পরিবেশে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ ও শোধনসহ ন্যানো প্রযুক্তির সার, বালাইনাশক উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ।

কৃষি গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে ব্যবহূত রাসায়নিক সারের ৫০ শতাংশের বেশি ও বালাইনাশকের ৯৮ শতাংশের বেশি নানাভাবে নন-টার্গেটেড জীব ও প্রতিবেশে অপচয় হয়। বর্তমানে এক কেজি চাল উৎপাদনে তিন-চার হাজার লিটার পানি ব্যবহার হয়। অস্বাভাবিক হারে অদক্ষ কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে শুধু যে ফসল উৎপাদন খরচ ভয়ানকভাবে বাড়ছে তা নয়, সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও অব্যবহূত রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে। এসব মোকাবেলায় কৃষিনীতিতে উপকরণের ব্যবহার হ্রাসের লক্ষ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যানো প্রযুক্তির গবেষণা ও প্রয়োগে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণায় উল্লিখিত চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

তবে ন্যানো প্রযুক্তি কী? কীভাবে প্রয়োজনীয় ন্যানো কণাগুলো তৈরি করা হয় এবং কৃষিতে কীভাবে এর প্রয়োগ করা যাবে ইত্যাদি প্রশ্ন এখন দেশের কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় সম্প্রতি ঢাকায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) কর্তৃক আয়োজিত কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি শিরোনামের একটি কনসালটেটিভ কর্মশালায়। যদিও ন্যানো প্রযুক্তি কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদের কাছে এটি একটি নতুন বিষয় বলেই মনে হচ্ছে। এর কারণ দুটি— ১. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে এবং বিষয়বস্তুতে ন্যানো প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত নয়; ২. দেশে কৃষি গবেষণার অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্ষেত্রগুলোয় ন্যানো প্রযুক্তি কখনো স্থান পায়নি। জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে ন্যানো প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদদের এ নতুন বিষয়ে কৌতূহলী ও উদ্বুদ্ধ করেছে বলেই মনে হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ন্যানো প্রযুক্তি কী, বাংলাদেশে ন্যানো প্রযুক্তির গবেষণার বাস্তবতা এবং কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো কিছুটা বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ হচ্ছে ২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় কৃষিনীতির হালনাগাদ ও সমৃদ্ধ সংস্করণ। এতে ২২টি অধ্যায় এবং ১০৬টি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদ রয়েছে। প্রণীত কৃষিনীতির লক্ষ্য নিরাপদ, টেকসই ও লাভজনক কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা এবং দক্ষতার সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা।

১৯৬৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত যুক্তরাষ্ট্রের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যানকে ন্যানো প্রযুক্তির জনক বিবেচনা করা হয়। তিনি ১৯৫৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির এক সভায় There’s Plenty of Room at the Bottom শিরোনামে এক যুগান্তকারী বক্তৃতায় ন্যানো প্রযুক্তির ধারণা দেন। তারপর ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ন্যানো টেকনোলজি শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন বিজ্ঞানী কে এরিক ড্রেংলার। ন্যানো প্রযুক্তিকে সংক্ষেপে ন্যানোটেক বলা হয়। এটি পদার্থকে আণবিক পর্যায়ে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করার বিদ্যা। ন্যানো প্রযুক্তি বহুমাত্রিক— প্রচলিত সেমিকন্ডাক্টর পদার্থবিদ্যা থেকে আধুনিক স্বয়ং সংশ্লেষণ প্রযুক্তি। আণবিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ থেকে নতুন ন্যানো পদার্থের উদ্ভাবন পর্যন্ত ন্যানো প্রযুক্তির বিস্তার সম্প্রসারিত।

প্রকৃতপক্ষে ন্যানো শব্দটি গ্রিক ‘Nanos’ থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘dwarf’ বা খাটো। কিন্তু এটি একটি মাপের একক। আর ন্যানোমিটার স্কেল বিস্তৃত সব প্রযুক্তিকে সাধারণভাবে ন্যানো প্রযুক্তি বলা হয়। ১৯৮৯ সালে ৩৫টি জেনন অণু দিয়ে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী আইবিএমের লোগো তৈরি করে দেখান যে পদার্থের অণুকে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে মানুষের পছন্দমতো অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব। প্রকৃতিতে রয়েছে ন্যানো প্রযুক্তির অনেক বিস্ময়কর উদাহরণ। যেমন— শুধু কাঠামোগত পার্থক্য থাকার কারণে কয়লা নরম, কালো ও সস্তা, কিন্তু হীরা শক্ত ও নানা বর্ণের। কয়লা ও হীরা উভয়ই কার্বন দ্বারা গঠিত। শুধু কার্বন অণু সজ্জিত হওয়ার ভিন্নতার কারণে পদার্থ দুটির এ বিস্ময়কর পার্থক্য। প্রতিটি জীবের ডিএনএতে চারটি অণু তথা এডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থায়ামিন বৈচিত্র্যময় অণুক্রমে সজ্জিত থাকে। ডিএনএ অণুও একটি ন্যানো পদার্থ ও বৈচিত্র্যময় অণুক্রমে সজ্জিত হওয়ার ফলে প্রতিটি জীবের ডিএনএ অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।

প্রয়োজনমাফিক নির্দিষ্ট আকার-আকৃতিবিশিষ্ট ন্যানো কণাগুলো তৈরি, সুদক্ষ পরিচালনা ও এর ব্যবহারকে একত্রে ন্যানো প্রযুক্তি বলা হয়। ন্যানো কণা হলো ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার আকারের অতিসূক্ষ্ম বস্তু, যা অণু ও পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত। ন্যানোমিটার হচ্ছে এক মিটারের এক কোটি ভাগের এক ভাগ। সেজন্য ন্যানো কণাগুলোকে আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। এমনকি সাধারণ মাইক্রোস্কোপ দ্বারাও ন্যানো কণাগুলোকে দেখা যায় না। ন্যানো টেকনোলজি গবেষণায় তাই ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ আবশ্যক। এ বহুমুখী গঠন ও আকৃতিবিশিষ্ট অতিসূক্ষ্ম কণার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেমন— আকারনির্ভর গুণাবলি, উচ্চপৃষ্ঠতল ও আয়তন অনুপাত এবং সংকটপূর্ণ দৈর্ঘ্যে অনন্য আলোক গুণাবলি। যা হোক, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ন্যানো কণাকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ১০ থেকে ১০০০ ন্যানোমিটার মাত্রা/আকারের প্রস্তুতকৃত বস্তুকণা, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। ন্যানো প্রযুক্তিকে একুশ শতকের একটি সর্বাপেক্ষা কার্যকর প্রযুক্তি বলা হয়। কারণ এ প্রযুক্তি শিল্পে যেমন— বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, বস্তুবিজ্ঞান, জ্বালানি ক্ষেত্র, ওষুধ শিল্প, জীবপ্রযুক্তি ও কৃষিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই উন্নয়নে চমকপ্রদ অবদান রাখতে সক্ষম। আধুনিক সব ইলেকট্রনিকসের সার্কিট ন্যানো কণা দ্বারা তৈরি। শুধু ইলেকট্রনিকস শিল্পেই নয়, ক্যান্সারসহ জটিল রোগ নির্ণয় ও নিরাময়, যথাস্থানে ওষুধ প্রয়োগ এবং চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানে ন্যানো টেকনোলজি এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

ন্যানো টেকনোলজির ইতিহাসে দুটি বড় আবিষ্কার হচ্ছে— ১. ২৯১৮ সালে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কার এবং ২. কার্বন অণুর দ্বারা ফুলেরিন আবিষ্কার। প্রথম সাফল্যটির জন্য জর্ড বিনিং, হাইনরিশ রোহরার ও আইবিএম জুরিখ রিসার্চ ল্যাবরেটরি যৌথভাবে ১৯৮৬ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়। আর ফুলেরিন আবিষ্কারের জন্য হ্যারি ক্রটো, রিচার্ড স্মলি ও রবার্ট কুরি ১৯৯৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যানো প্রযুক্তিতে ব্যবহূত ন্যানো পদার্থগুলো তৈরি করা হয়। এর একটি হলো ওপর থেকে নিচে (Top to down) এবং অন্যটি হলো নিচ থেকে ওপর (Down to Top)। টপ টু ডাউন পদ্ধতিতে কোনো পদার্থকে কেটে নির্দিষ্ট ন্যানো আকার ও গঠন দেয়া হয়। আর ডাউন টু টপ প্রক্রিয়ায় অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারের অণু দিয়ে নির্দিষ্ট গাঠনিক ন্যানো পদার্থ তৈরি করা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত সব ইলেকট্রনিক হলো টপ টু ডাউন প্রক্রিয়ায় তৈরি ন্যানো প্রযুক্তি। ন্যানোমিটার স্কেলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নতুন প্রযুক্তির অধিকাংশই আজ ডাউন টু টপ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে। কম্পিউটারের ভেতর যে প্রসেসর রয়েছে, তা আসলে সিলিকনের ওপর প্যাটার্ন করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ন্যানোমিটার স্কেলের সার্কিট। কম্পিউটারের উচ্চ মেমোরিসম্পন্ন হার্ডডিস্ক ও সেলফোনে ব্যবহূত সার্কিটও ন্যানো প্রযুক্তি।

গত শতাব্দীতে সবুজ বিপ্লবে যে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার হয়েছিল, তা শতকোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়েছে এবং বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে এ বিপ্লবে ব্যবহূত অত্যধিক মাত্রায় বাসায়নিক, পানি সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপরকরণ পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলছে। এছাড়া এটি স্পষ্ট, সবুজ বিপ্লবের হাতিয়ার কৃষি উপকরণগুলো প্রয়োগে কৃষিতে ফলন বৃদ্ধি অতীতের তুলনায় কম হারে হচ্ছে। কৃষি ক্রমে অলাভজনক শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ফলে বর্তমান কৃষি একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল এবং অধিকতর উপকরণ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাড়া না দেয়ায় এক সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উচ্চ উৎপাদন খরচ ও পরিবেশের ওপর কৃষিতে ব্যবহূত ক্ষতিকর রাসায়নিকের কুপ্রভাবের ফলে সবুজ বিপ্লবের উচ্চ উপকরণনির্ভর শস্য উৎপাদন প্রযুক্তিগুলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে কার্যত টেকসই হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে না। অন্যদিকে বিশ্বের জনসংখ্যা ২০৫০ সাল পর্যন্ত ৭ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবর্তিত জলবায়ুতে রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ও অজৈব অভিঘাতের কারণে ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত শস্য উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে চাহিদার ভিত্তিতে নতুন ও অধিকতর কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। সম্ভবত সে বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে জীবপ্রযুক্তি ও ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী দিনের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতের নীতি গ্রহণ করেছে।

কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যানো প্রযুক্তি একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ন্যানো কণার ব্যবহার নাটকীয়ভাবে উদ্ভিদ পুষ্টি উন্নয়ন, সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফসলে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয়, বালাই দমন, খাদ্য মোড়কীকরণ, অজৈব অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, নতুন ন্যানো কণা কার্যকরভাবে শস্য সংরক্ষণের জন্য বালাইনাশকের কার্যকারিতা ও নিরাপদ ব্যবহারে উন্নয়ন ঘটাতে পারে। অনুরূপভাবে ন্যানো সার স্লো রিলিজ বা ধীরে ধীরে উদ্ভিদের গ্রহণ উপযোগী হওয়া এবং ধীর অবক্ষয়ের মাধ্যমে কার্যকরভাবে সার ব্যবহারের দক্ষতার প্রভূত উন্নয়ন করতে পারে। ন্যানো কণার ব্যবহার অথবা ন্যানো বাহকের ভেতরে সারের উপাদান ব্যবহার শস্যের বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। টেকসই উদ্ভিদ পুষ্টি ও ফসল উৎপাদনের জন্য ন্যানো উপাদানের দক্ষতা আজ প্রমাণিত। সম্প্রতি ব্যাকটেরিয়াল ও ছত্রাকজনিত সংক্রামক রোগ দমনে জীবাণু প্রতিরোধী দিনের আলোয় রিচার্জেবল ন্যানো তন্তু ঝিল্লিগুলো আলোতে কার্যকর রাসায়নিক যৌগগুলো একত্রিত করে তৈরি করা হয়েছে। এসব ন্যানো পদার্থ দিনের আলোয় দক্ষতার সঙ্গে ক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি (Reactive oxygen species) উত্পন্ন করে রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করতে পারে। জীবাণু প্রতিরোধী ন্যানো সূর্যালোকে চার্জেবল ন্যানো উপাদান তৈরির এ চমকপ্রদ কৌশল টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় বালাই দমনে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। ন্যানো প্রযুক্তির ডিভাইস ও যন্ত্রপাতি যেমন— ন্যানো ক্যাপসুল, ন্যানো কণা, ন্যানো রোবট, এমনকি ভাইরাস ন্যানো ক্যাপসিড সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায়, উদ্ভিদ পুষ্টি গ্রহণ ত্বরান্বিতকরণ, সুনির্দিষ্ট স্থানে কার্যকর উপাদান ডেলিভারি এবং পানিশোধন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব। উদ্ভিদ প্রজনন ও জেনোমিক রূপান্তরেও ন্যানো কণার ব্যবহার হয়। ন্যানো প্রযুক্তির সম্ভাবনাগুলো প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিউক্লিয়েজনির্ভর জেনোম সম্পাদনা আরো দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব। ন্যানো কণাভিত্তিক ডেলিভারি উদ্ভিদে জিন প্রকৌশল ও জেনোম সম্পাদনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। সুতরাং কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলো খুবই বিস্তৃত এবং যথাযথভাবে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকে আরো টেকসই ও লাভজনক করা সম্ভব। তবে এজন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি ও দেশের চাহিদামাফিক গবেষণা।

কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। তা সত্ত্বেও ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সমাধানের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। যেমন— অধিকাংশ ন্যানো কণার বাণিজ্যিক উৎপাদন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। কৃষিতে ন্যানো কণা বাণিজ্যিকীকরণের আগে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকারক দিকগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, শর্করাভিত্তিক ন্যানো কণার ন্যানোটক্সিক কার্যকারিতা নেই এবং ফলে তা সার, বালাইনাশক ও জৈব অনুঘটক এবং ওষুধ ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত ন্যানো কণা ও ন্যানো গঠনবিশিষ্ট পদার্থের অনন্য রাসায়নিক, ভৌত ও যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব কৌতূহলোদ্দীপক ন্যানো কণা হলো তড়িৎ চৌম্বকীয় সক্রিয় ন্যানো টিউব, ন্যানো তন্তু ও ফুলেরিন, এসব পদার্থে উচ্চসংবেদনশীল জৈব রাসায়নিক সেন্সর ধর্মের জন্য ব্যবহারিক প্রয়োগ যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। এসব ন্যানো সেন্সর কার্যকর মৃত্তিকা বিশ্লেষণ, সহজতর জৈব রাসায়নিক সেন্সিং ও নিয়ন্ত্রণ, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয়, বালাইনাশক ও পুষ্টি উপাদান ডেলিভারিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। ন্যানো প্রযুক্তির অন্য আরেকটি চমকপ্রদ ব্যবহার হচ্ছে কৃষিবর্জ্য থেকে উচ্চমূল্যের দ্রব্যাদি তৈরি এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন করা।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ন্যানো প্রযুক্তি যেসব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গবেষণা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেগুলো হলো উদ্ভিদ পুষ্টি, শস্য সংরক্ষণ, রোগ বিস্তার-সংক্রান্ত বিষয় ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ নির্ণয়, জীবপ্রযুক্তি, প্রাণী স্বাস্থ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পণ্য প্যাকেটজাত, পানি ব্যবহার দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি কার্যক্রম। ন্যানো কণা ব্যবহারে আরো যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা হলো ১. কিছু ন্যানো কণার পেটেন্ট রয়েছে, যার জন্য অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান; ২. কৃষিতে ন্যানো কণা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও নীতির অপ্রতুলতা রয়েছে; ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ন্যানো কণার গবেষণায় সামর্থ্যের (মানবসম্পদ ও স্থাপনা) সীমাবদ্ধতা রয়েছে; ৪. ন্যানো বিষাক্ততা— কিছু ন্যানো কণা জিন বিবর্তন (মিউটেশন) করতে সক্ষম, ডিএনএ ধ্বংস করে এবং ন্যানো নন-টার্গেটেড জীবের প্রতি বিষাক্ততা তৈরি করতে পারে। সেজন্য কৃষিতে নতুন ন্যানো কণা সূচনার আগে এর যথাযথ নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গবেষণার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রির) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পার্টনারশিপ খুবই দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মৌলিক জ্ঞান সৃজনের লক্ষ্য নির্ধারণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আবিষ্কৃত নতুন জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণে রোডম্যাপ তৈরি আশু প্রয়োজন। জাতীয় অভীষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে জ্ঞান, দক্ষতা ও সামর্থ্যের সমন্বিত এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং কৃষির বর্তমান ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ন্যানো প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগে উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবান্ধব। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ যে যথেষ্ট ভবিষ্যত্মুখী, তা প্রমাণ করে। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো প্রযুক্তি কৃষকের মাঠপর্যায়ে এখনো তেমন একটা শুরু হয়নি। কিন্তু শিগগিরই কৃষিতে নানা রকম ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হবে, তা আশা করা যায়। বাংলাদেশে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে রোগ নির্ণয়, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ন্যানো পেস্টিসাইড, ন্যানো ফার্টিলাইজার, ন্যানো হার্বিসাইড, অগ্রাধিকারভিত্তিক ফুড প্যাকেজিং, ওষুধ ডেলিভারি, মৃত্তিকা দূষণ নির্ণয় ও দূরীকরণ, ফসল উন্নয়ন (জাত), উদ্ভিদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যানো সেন্সর, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনাময়, তবে বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তি খুব একটা অন্তর্ভুক্ত নয়। সফল ন্যানো প্রযুক্তি উদ্ভাবনে রসায়নবিদ, পদার্থবিদ, বস্তু বিজ্ঞানী, কৃষি বিজ্ঞানী ও জীব বিজ্ঞানীদের যৌথ ও সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। অন্যথায় এটি শুধু কাগুজে নীতি হিসেবে থেকে যাবে।

বাংলাদেশে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক আলোচনা জাতীয় পর্যায়ে শুরু হয় ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালার মাধ্যমে। ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্মশালাটি উদ্বোধন করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে দুই দিনব্যাপী কর্মশালাটি চলে। তখন দেশে ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণার জন্য একটি স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত বা স্বপ্রণোদিতভাবে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা চলছে। মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে আমাদের বিজ্ঞানীরা ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক বিশ্বজ্ঞানভাণ্ডারে অবদান রেখে চলেছেন। তবে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তিকে কৃষি উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ থাকায় এ বিষয়ে প্রায়োগিক গবেষণায় গতিসঞ্চার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে এ দেশে বিদেশ থেকে উচ্চমানের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষক রয়েছেন। এছাড়া বিদেশেও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অনেক উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন ন্যানো টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। এসব গবেষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এখন প্রয়োজন হচ্ছে চাহিদামাফিক ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও কোলাবোরেটিভ গবেষণা প্রকল্প এবং এর বাস্তবায়ন।

ন্যানো টেকনোলজিতে দ্রুতগতিতে নতুন নতুন আবিষ্কারের সংযোজনের ফলে এর ব্যবসাও দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ন্যানো টেকনোলজি সম্পর্কিত পণ্যের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পৃথিবীতে ন্যানোটেক গবেষণায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের। তবে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশও ন্যানোটেক গবেষণায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকায় ২০০৮ সালে স্লিনটেক (শ্রীলংকা ইনস্টিটিউট অব ন্যানো টেকনোলজি) নামে ন্যানো টেকনোলজিবিষয়ক উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটি ২০১৭ সালে স্লিনটেক একাডেমি নামে বেসরকারি বিনিয়োগে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে স্লিনটেক ন্যানো পদার্থভিত্তিক উচ্চদক্ষতা ও ধীরগতিতে পুষ্টি সরবরাহকারী ন্যানো ফার্টিলাইজার উদ্ভাবন করেছে এবং তা ২ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করে ন্যানোটেক গবেষণার ব্যবসায়িক সাফল্য প্রমাণ করেছে। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের রোল মডেল হতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ন্যানোটেক-বিষয়ক কিছু গবেষণা হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এসব গবেষণার প্রায় সবই একাডেমিক। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানে এবং লাভজনক কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যোৎপাদনে দেশে ন্যানোটেক বিষয়ে কতটুকু গবেষণা হচ্ছে, তার কোনো পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন আয়োজিত কর্মশালায় জানা যায়, দেশে ন্যানো বায়োটেকনোলজি গবেষণায় উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন বেশকিছু গবেষক আছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যানো বায়োটেকনোলজি শিরোনামে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি কোর্স ছাড়া ন্যানো টেকনোলজিবিষয়ক কোনো কোর্স বা বিষয়বস্তু এ দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পড়ানো হয় কিনা, তা আমার জানা নেই।

দেশে এরই মধ্যে কৃষিতে ন্যানোটেক-বিষয়ক কিছু গবেষণায় সাফল্যের নজির রয়েছে। সম্প্রতি বুয়েট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুলভাবে ব্যবহূত সেলুলোজ দ্বারা তৈরি কাগজে জীবাণুরোধী গুণাবলি আরোপ করার কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ উদ্ভাবন আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির বিখ্যাত জার্নাল ‘এসিএস সাসটেইনেবল কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ প্রকাশিত হয়েছে। জীবাণুরোধী সিলভার ন্যানো কণা কাগজের ওপর সংযোজনের জন্য বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক শামুক ও ঝিনুকের মধ্যে বিদ্যমান পলিডোপামিন নামে বিশেষ প্রাকৃতিক যৌগের বৈশিষ্ট্য ধার করেন। পলিডোপামিনের উপস্থিতির কারণে সমুদ্রের প্রবল ঢেউ উপেক্ষা করেও পাথর ও সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে শামুক ও ঝিনুক নিজেদের শক্তভাবে আটকে রাখতে পারে। উদ্ভাবিত ন্যানো সিলভার কণা সংযোজিত কাগজ, তাই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ নানা রকম ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকারক ছত্রাক দমনে এটি খুবই কার্যকর হতে পারে। উদ্ভাবিত জীবাণুরোধী এ কাগজ মূল্যবান পণ্য, ওষুধ, খাদ্য ও কৃষিজ পচনশীল উৎপাদন যেমন— মাছ, ফলমূল এবং সবজি পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান ও জাপানি বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানীরা অতি ছিদ্রবহুল ধাতব ন্যানো ক্যাটালাইটিক কনভার্টার উদ্ভাবন করেছেন, যা যানবাহনের জ্বালানি দহনের পর নির্গত বায়ুদূষক পরিশোধনে খুবই কার্যকর। এ গবেষণার ফল ২০১৭ সালে বিশ্বখ্যাত ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের পাটের আঁশ ও পশুর হাড় থেকে অতি ছিদ্রবহুল ও উচ্চ পৃষ্ঠতলসম্পন্ন মেসো ও ন্যানো কার্বন তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি ন্যানো ও মেসো কার্বন অতি মূল্যবান শিল্পসামগ্রী হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশে পাট ও পশুর হাড় পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। সুতরাং উদ্ভাবিত ন্যানো কার্বন কণা প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করা সম্ভব। এছাড়া আমাদের বিজ্ঞানীরা পাট থেকে অত্যন্ত মূল্যবান সুগার মনোমার তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক আমাদের গবেষণার ফলাফল বিশ্বখ্যাত নেচারস সায়েন্টিফিক রিপোটর্স, মাইক্রোপোরাস ও মেসোপোরাস ম্যাটেরিয়েলস, ম্যাটেরিয়াল কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিজিকস, সাসটেইনেবল এনার্জি ফুয়েলস, জার্নাল অব ভিজুয়ালাইজড এক্সপেরিমেন্টস, জার্নাল অব ন্যানো সায়েন্স অ্যান্ড ন্যানো টেকনোলজি, জার্নাল অব ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি, ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ইনঅর্গানিক কেমিস্ট্রি, ম্যাটেরিয়ালস লেটার ইত্যাদি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি আমরা গমের ব্লাস্ট রোগ সফলভাবে দমনে কার্যকর ন্যানো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছি। উদ্ভাবিত এ ন্যানো প্রযুক্তি এ বছর মেহেরপুরে মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হবে। পাট থেকে মূল্যবান চিনিজাতীয় পদার্থ তৈরি ও ধাতব ন্যানো কণার মাধ্যমে গমের জন্য মারাত্মক ব্লাস্ট রোগ দমনের কৌশলগুলো বর্তমানে পেটেন্ট প্রক্রিয়াধীন।

আমি মনে করি, দেশে ন্যানোটেক গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ন্যানো কণা বৈশিষ্ট্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। ন্যানো পদার্থের বৈশিষ্ট্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন— স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ, ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, অ্যাটমিক ফোর্স-মাইক্রোস্কোপ ইত্যাদি কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করলে দেশে ন্যানো প্রযুক্তি গবেষণায় গতিসঞ্চার হবে। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিক কিছু কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এগুলো হলো: ১. জীবপ্রযুক্তির মতো দেশে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি টাস্কফোর্স গঠন করা; ২. দেশে ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করা। এতে জাতীয়ভাবে ন্যানো প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ ও কৃষি গবেষণায় অবদান রাখতে সক্ষম বিজ্ঞানীদের সামর্থ্য জানা যাবে; ৩. ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ভৌত সুবিধাদি প্রতিষ্ঠাকরণ। এক্ষেত্রে শ্রীলংকার স্লিনটেক নামের ন্যানো প্রযুুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সফলতার অভিজ্ঞতা অনুসরণ করা যেতে পারে; ৪. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক কোর্স ও বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তকরণ; ৫. তরুণ গবেষকদের ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন; ৬. জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের নিয়ে ইন্টারডিসিপ্লিনারি গবেষক দল গঠন করে টার্গেট ওরিয়েন্টেড গবেষণার জন্য গবেষণা বরাদ্দ প্রদান; ৭. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গবেষণার ফলাফল দ্রুত ব্যবহার উপযোগী শিল্প উপাদানে রূপান্তরে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৮. ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা।

উপসংহারে বলা যায়, নতুন ন্যানো কণা যেমন— ন্যানো সার, ন্যানো বালাইনাশক, ন্যানো বাহক, ন্যানো সেন্সর, ন্যানো মোড়কীকরণ ও ন্যানো চিপ শস্যের স্মার্ট পুষ্টি, উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিতভাবে নিখুঁত ও স্মার্ট কৃষির প্রসার ঘটিয়ে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করবে এবং শস্য সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমাবে। জৈব বস্তুপুঞ্জ যেমন— পাটের আঁশ থেকে প্রাপ্ত বহু ছিদ্রযুক্ত ন্যানো কার্বন উল্লেখযোগ্য হারে কৃষি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে উচ্চমূল্য সংযোজন করবে। নতুন ন্যানো কণার ব্যবহার ন্যানো জীবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশলে প্রসার ঘটাবে। তবে ন্যানো কণার যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে নতুন ন্যানো কণা উদ্ভাবন, কৃষিক্ষেত্রে এর নিরাপদ ব্যবহারের জন্য চাহিদামাফিক রূপকল্পনির্ভর আন্তঃবিভাগীয় কোলাবোরেটিভ গবেষণা জোরদার করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।

লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়